আপনার লিভার কি সুস্থ্য? কিভাবে লিভার সুস্থ্য রাখবেন?

লিভার (যকৃৎ) দেহের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। আমাদের শরীরের বিপাকীয় কার্যাবলী লিভারই সম্পাদন করে। এই অঙ্গ থেকে নিসৃত জারক রসেই খাবার হজম হয়। যাদের লিভার দুর্বল, তাদের পেটে সারাবছর সমস্যা লেগেই থাকে। গবেষকের মতে, লিভারের রোগকে নীরব ঘাতক বলা হয়। কেননা লিভারের যেকোনো রোগ সাধারণত প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়ে না। রোগ বেড়ে গেলে এর লক্ষ্মণ প্রকাশ পায়। অনেক সময় তখন আর কিছু করার থাকে না। লিভার ভালো না থাকার লক্ষণগুলো জেনে নিন-

* দুর্গন্ধযুক্ত নিঃশ্বাসঃ মুখের স্বাস্থ্য ভালো থাকার পরেও যদি আপনার নিঃশ্বাসের সঙ্গে দুর্গন্ধ বের হয় তাহলে বুঝবেন যে আপনার লিভারের কোনো সমস্যা আছে। লিভারের স্বাস্থ্য ভালো না থাকার একটি লক্ষণ এটি।

* অকারণে ওজন বেড়ে যাওয়াঃ লিভার যেহেতু চর্বি হজমের জন্য প্রধানত দায়ী সেহেতু এটি যথাযথভাবে কাজ না করলে দেহে চর্বি জমতে থাকে। যার ফলে ব্যাখ্যাতীতভাবে অকারণে ওজন বাড়তে থাকে।

* অ্যালার্জিঃ লিভার ভালো থাকলে তা এমন সব অ্যান্টিবডি তৈরি করে যেগুলো অ্যালার্জেন বা অ্যালার্জি সৃষ্টিকারী উপাদানগুলোকে আক্রমণ করে ধ্বংস করে। কিন্তু লিভারের কার্যক্ষমতা কমে গেলে দেহ ওই অ্যালার্জি সৃষ্টিকারী উপাদানগুলোকে জমা করতে থাকে। এর প্রতিক্রিয়ায় আবার দেহ হিস্টামিন উৎপাদন করতে থাকে যা অ্যালার্জি সৃষ্টিকারক উপাদানগুলো দূর করতে কাজ করে। কিন্তু অতিরিক্ত হিস্টামিন উৎপাদন হলে আবার চুলকানি, ঝিমুনি এবং মাথা ব্যথা হতে পারে।

*ক্রমাগত অবসাদঃ দেহে টক্সিন জমা হলে তা মাংসপেশির টিস্যুর বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় বাধার সৃষ্টি করে। যা থেকে আবার ব্যাথা এবং শারীরিক অবসাদও সৃষ্টি হতে পারে। ক্লান্তি থেকে মেজাজ খিটখিটে হওয়া, মানসিক অবসাদ এবং ক্ষোভের বিস্ফোরণের মতো সমস্যাও তৈরি হতে পারে। লিভার ভালো না থাকার শীর্ষ লক্ষণগুলোর একটি এটি। দেহে অতি উচ্চ মাত্রায় টক্সিন বা বিষ জমা হওয়ারও একটি লক্ষণ এটি।

* অতিরিক্ত ঘাম বের হওয়াঃ বেশি বেশি কাজ করার কারণে লিভারের কার্যক্ষমতা কমে যায় এবং সেটি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তখন লিভার দেহের অন্যান্য অঙ্গেও তাপ ছড়িয়ে দেয় এবং অতিরিক্ত ঘাম বের করার মাধ্যমে লিভার নিজেকে ঠাণ্ডা করে।

* ব্রণঃ লিভারে জমা হওয়া টক্সিন দেহে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করতে যারে। যা থেকে ত্বকে ব্রণ সৃষ্টি হতে পারে। কার্যক্ষমতা হারানো লিভারের কারণে সৃষ্ট ত্বকের এই সমস্যা ততক্ষণ পর্যন্ত যাবে না যতক্ষণ না পুনরায় লিভারের কার্যক্ষমতার উন্নতি ঘটানো হবে।

যেভাবে লিভার সুস্থ্য রাখবেন

তবে যাদের লিভার সুস্থ আছে তারা কিছু খাবার নিয়মিত খেলে রোগব্যাধি এ অঙ্গটি থেকে দূরে থাকবে। যেমন-
* লেবুর গরম পানিঃ  অন্যান্য খাবারের তুলনায় কুসুম গরম পানিতে লেবু চিপে খাওয়ার অভ্যাস লিভারে অনেক বেশি এনজাইম উৎপাদনে সহায়তা করে, এছাড়াও ভিটামিন সি গ্লুটেথিয়ন নামক যে এনজাইম উৎপন্ন করে তা লিভারের ক্ষতিকর টক্সিন দূর করে লিভার পরিষ্কার রাখতে সহায়তা করে। তাই সকালে ঘুম থেকে উঠে ১ গ্লাস কুসুম গরম পানিতে সামান্য লেবু চিপে পান করুন। এতে করে লিভার পরিষ্কার থাকবে।

* সবুজ চাঃ  সবুজ চায়ের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট আমাদের দেহের ফ্রি সার্জিকেল টক্সিসিটি দূর করে এবং আমাদের লিভার পরিষ্কার রাখতে সহায়তা করে। প্রতিদিন ১-২ কাপ সবুজ চা পান করার ফলে লিভারে জমে থাকা টক্সিন দূর হয়ে যায় এবং পুরো দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সঠিকভাবে কাজ করতে সক্ষম হয়।

* রসুনঃ  রসুনে রয়েছে সালফারের উপাদান যা লিভারের এঞ্জাইমের সঠিক কাজে সহায়তা করে। এছাড়াও রসুনে রয়েছে অ্যালিসিন ও সেলেনিয়াম যা লিভার পরিষ্কারের পাশাপাশি লিভারের সুস্থতা নিশ্চিত করে। তাই খাবারে প্রতিদিন রসুন ব্যবহার করার অভ্যাস গড়ে তুলুন।

* হলুদঃ  লিভারের সবচেয়ে পছন্দের খাদ্য উপাদান হলুদ। হলুদ একটি নিরাময় ওষুধ হিসেবে বিবেচিত। এলিভারের ডিটক্স এর পরিমাণ বৃদ্ধি করে, লিভারকে পরিষ্কার করে। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করে সেইসঙ্গে আমাদের ইমিউন সিস্টেম এর জন্য ব্যবহার করা হয় হলুদ। এটা ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে পারে।

* আপেলঃ  পেক্টিন নামক এক প্রকার উপাদান রয়েছে আপেলে। যা শরীরের খারাপ উপাদানগুলো দূর করে ও পরিপাকতন্ত্রকে টক্সিনমুক্ত করে। লিভারকেও টক্সিনমুক্ত করার কারণে, লিভার সঠিকভাবে কাজ সম্পন্ন করতে পারে।

* সবুজ শাকসবজিঃ  লিভারকে পরিষ্কার ও সক্রিয় রাখার ক্ষেত্রে সব থেকে ভাল খাবার হল সবুজ শাকসবজি। সবুজ শাক রান্না করে বা জুস করে খেতে পারেন। এটিতে রক্তের টক্সিন মুক্ত রাখার উপাদান রয়েছে।

লিভারের জটিল রোগসমূহ, লক্ষণ ও চিকিৎসায় করণীয়

আমাদের দেশে যে সব লিভারের জটিল রোগ হয়ে থাকে সেই সব রোগ এর লক্ষণ, প্রতিরোধে ও চিকিৎসায় করণীয় সম্পর্কে বর্ননা করা হলো।

ভাইরাল হেপাটাইটিস

হেপাটাইটিস হলো লিভারে প্রদাহ, সাধারনত হেপাটাইটিস এ, বি, সি, ডি এবং ই ভাইরাস দ্ধারা স্বল্প মেয়াদী প্রদাহ কে ভাইরাল হেপাটাইটিস বলে। আমরা অনেকেই এই ধরনের রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেলে তাকে জন্ডিস বলি। দূষিত পানি ও খাবারের মাধ্যমে ‘এ’ এবং ‘ই’ ভাইরাস ছড়ায় এবং স্বল্প মেয়াদী লিভার প্রদাহ করে থাকে।

ভাইরাল হেপাটাইটিস এর লক্ষণ
একিউট ভাইরাল হেপাটাইটিস বা স্বল্পমেয়াদী লিভার প্রদাহের প্রধান লক্ষণগুলো হলো— জন্ডিস, খাবারে অরুচি, উপরের পেটের ডান দিকে বা মাঝখানে ব্যথা, বমি বমি ভাব ও বমি, দুর্বলতা ও জ্বর।

ভাইরাল হেপাটাইটিস হলে করণীয়
রোগীকে হলুদ, মরিচ, তরিতরকারি, মাছ-মাংস ইত্যাদি স্বাভাবিক খাবার খেতে দিন। ফল, ডাবের পানি, আখের রস ইত্যাদি খাওয়াবেন না। ঘন ঘন গোসল করাবেন না। ১ থেকে ২ সপ্তাহের মধ্যে যদি রোগের লক্ষণ ভালো না হয়, তবে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করবেন। রোগ ধরা পরার পর কেউ অস্থিরতা, অস্বাভাবিক আচরণ করলে বা অজ্ঞান হলে, এটা মারাত্মক জরুরি অবস্থা। তাকে অনতিবিলম্বে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে।

ক্রনিক হেপাটাইটিস

লিভারের দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহের ফলে যেসব রোগ হয়ে থাকে তাকে ক্রনিক হেপাটাইটিস বলে। হেপাটাইটিস বি, সি ও ডি ভাইরাস রক্ত কিংবা দূষিত সিরিঞ্জ বা সুচের মাধ্যমে ছড়ায়। তবে হেপাটাইটিস ই-ভাইরাস রক্তের মাধ্যমেও ছড়ায়। বাংলাদেশে ক্রনিক হেপাটাইটিসের প্রধান কারণ হেপাটাইটিস বি এবং সি ভাইরাস। রোগী প্রাথমিক অবস্থায় বুঝতেই পারেন না কখন তিনি বি অথবা সি ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। চিকিৎসাবিহীন থাকলে এই সংক্রমণ মাসের পর মাস লিভার এর ক্ষতি করে। এমনকি লিভার সিরোসিসে রূপ নেয় এবং পরে লিভার ক্যান্সারে রূপান্তরিত হতে পারে। উল্লেখ্য, হেপাটাইটিস ‘বি’ এবং ‘সি’ ভাইরাস আমাদের দেশে যথাক্রমে ৬০ ও ৩০ শতাংশ লিভার সিরোসিস এবং যথাক্রমে ৬৪ ও ১৭ শতাংশ হেপাটোসেলুলার কারসিনোমা বা লিভার ক্যান্সার এর জন্য দায়ী।

ক্রনিক হেপাটাইটিসের লক্ষণসমূহ
ক্রনিক ভাইরাল হেপাটাইটিস তথা দীর্ঘ মেয়াদী লিভার প্রদাহে ভাইরাস সুপ্ত অবস্থায় লিভারের কোষে বংশবৃদ্ধি করতে থাকে। ফলে কোনো সুস্পষ্ট লক্ষণ পাওয়া যায় না। কারও কারও ক্ষেত্রে দুর্বলতা, ক্ষুধামন্দা ও পেটে হালকা ব্যথা অনুভূত হতে পারে। রোগের লক্ষণ দেখে পরীক্ষা ছাড়া বোঝার উপায় নেই কোন ভাইরাস হয়েছে। কিন্তু যাদের ক্রনিক ভাইরাল হেপাটাইটিস থেকে লিভার সিরোসিস হয়ে যায় তাদের ক্ষুধামন্দা, পেটের অসুখ, শরীর শুকিয়ে যাওয়া, জন্ডিস, পেটে পানি আসা ও চেতনালোপ জাতীয় লক্ষণ দেখা দেয়।

ক্রনিক হেপাটাইটিস হলে করণীয় ও চিকিৎসা
এমতাবস্থায় অনতিবিলম্বে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে পরিক্ষা করাতে হবে যে এই ভাইরাসের প্রাণ HBV DNA বা HBeAg রক্তে বহমান কিনা? এবং তা ছয় মাসের বেশি সময় ধরে পজেটিভ কিনা? ভাইরাসটা লিভারে সংক্রামিত হয়ে লিভারের ক্ষতি করে লিভার এনজায়েম ALT(SGPT) বাড়িয়ে দিয়েছে কিনা? যদি রোগীর রক্তে HBV DNA বা HBeAg ছয় মাসের বেশি সময় পরেও বিদ্যমান থাকে, রক্তে ALT (SGPT) দুই বা আড়াই গুণেরও বেশি থাকে তখন মানুষটি রোগী বলে বিবেচিত হবেন। কিন্তু ALT (SGPT) পরিমাণ যদি স্বাভাবিক থাকে, HBV DNA ও HBeAg নেগেটিভ থাকে তবে কিন্তু তিনি রোগী নন, HBsAg বহনকারী সুস্থ Carrier, তার চিকিৎসা অনাবশ্যক, তিনি এই রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতাহীন এবং এর প্রতিষেধকও নিতে পারবেন না।

লিভার সিরোসিস

লিভার সিরোসিস একটি মারাত্মক ও অনিরাময়যোগ্য রোগ। তবে কিছু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিলে লিভার সিরোসিস থেকে অনেকটা দূরে থাকা যায়। এতে যকৃৎ বা লিভারের কোষকলা এমনভাবে ধ্বংস হয়ে যায় যে তা সম্পূর্ণ বিকৃত ও অকার্যকর হয়ে পড়ে এবং প্রদাহ এর কারণে লিভারে ফাইব্রোসিস এবং নুডিউল বা গুটি গুটি জিনিস তৈরি হয় ফলে লিভার এর যেসব স্বাভাবিক কাজ আছে, যেমন বিপাক ক্রিয়া, পুষ্টি উপাদান সঞ্চয়, ওষুধ ও নানা রাসায়নিকের শোষণ, রক্ত জমাট বাঁধার উপকরণ তৈরি ইত্যাদি কাজ ব্যাহত হয়। দেখা দেয় নানাবিধ সমস্যা। এ ছাড়া কিছু জন্মগত অসুখের কারণেও এই সমস্যা হয়ে থাকে যেমন, ওইলসন ডিজিজ, হেমোক্রোমেটাসিস ইত্যাদি। ধীরে ধীরে এই রোগ মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়। তাই সকলের আগে থেকেই এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহন করা প্রয়োজন।

লিভার সিরোসিসের লক্ষণ
প্রাথমিক লক্ষণ ধরা পড়তে দেরি হয় তবে সাধারনত রক্তস্বল্পতা, রক্ত জমাট বাঁধার অস্বাভাবিকতা, যকৃতে বেশি পরিমাণে জৈব রসায়ন, বেশি বিলুরুবিন, কম সিরাম অ্যালবুমিন ইত্যাদি সমস্যা ধরা পড়তে পারে। সিরোসিস সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পেটের আল্ট্রাসনোগ্রাম ও যকৃতের বায়োপসি করতে হয়। সাধারণত খাদ্যে অরুচি, ওজন হ্রাস, বমি ভাব বা বমি, বমি বা মলের সঙ্গে রক্তপাত, শরীরে পানি আসা ইত্যাদি হলো মূল উপসর্গ। পরে যকৃতের অকার্যকারিতার সঙ্গে কিডনির অকার্যকারিতা, রক্তবমি, রক্তে আমিষ ও লবণের অসামঞ্জস্য ইত্যাদি জটিলতা দেখা দেয়।

লিভার সিরোসিস হলে করণীয় ও চিকিৎসা
লিভার সিরোসিস চিকিৎসার মূল বিষয় হচ্ছে প্রতিরোধ। যেসব কারণে লিভার সিরোসিস হয়ে থাকে, বিশেষ করে হেপাটাইটিস বি-এর যেহেতু প্রতিশেধক আছে। তাই আমাদের উচিত প্রত্যেকেরই এই প্রতিশেধক নেওয়া। পাশাপাশি কিছু সচেতনতা জরুরি। দূষিত কোনো সূঁচ বা যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করা, কোনো দূষিত রক্ত পরিসঞ্চালন না করা পাশাপাশি সেলুনে সেভ করাসহ যেকোনো কাটাকাটি বা সেলাইয়ের সময় এই বিষয়গুলো মাথায় রাখতে হবে। রোগীদের কাছ থেকে সরাসরি এই ভাইরাস সংক্রমিত হয় না।

লিভার ক্যান্সার

ক্যান্সার মানেই তো আতঙ্ক আর তা যদি হয় লিভারের মত দেহের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে তাহলেতো কথাই নেই। গবেষনায় প্রমানিত, এদেশে ক্যান্সারে মৃত্যুর তৃতীয় প্রধান কারণ লিভার ক্যান্সার। বিশ্বব্যাপি লিভার ক্যান্সারের মূল কারণ হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাস আর এ্যালকোহল। আমাদের দেশে অবশ্য হেপাটাইটিস বি আসল খলনায়ক, কারণ এদেশে প্রায় ৮০ লক্ষ লোক এ ভাইরাসের বাহক বা HBsAg পজেটিভ। হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত ৫ থেকে ১০ শতাংশ লোক জীবনের কোন এক পর্যায়ে এ রোগে আক্রান্ত হতে পারেন।

লিভার ক্যান্সারের লক্ষণ
যে কোন বয়সের লোকই এ রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। লিভার ক্যান্সারের ঝুকি পুরুষদের ক্ষেত্রে মহিলাদের চেয়ে ৪ থেকে ৬ গুণ বেশী। সাধারণতঃ ক্যান্সার হওয়ার আগে লিভারে সিরোসিস দেখা দেয়, তবে এর ব্যতিক্রম হওয়াটাও অস্বাভাবিক না। লিভার ক্যান্সারের রোগীরা প্রায়ই পেটের ডান পাশে উপরের দিকে অথবা বুকের ঠিক নীচে মাঝ বরাবর ব্যথা অনুভব করেন যার তীব্রতা রোগী ভেদে বিভিন্ন রকম। সহজেই ক্লান্ত হয়ে পরা, পেট ফাপা, ওজন কমে যাওয়া আর হালকা জ্বর জ্বর ভাব এ রোগের অন্যতম লক্ষণ। লিভার ক্যান্সার রোগীদের প্রায়ই জন্ডিস থাকে না, আর থাকলেও তা খুবই অল্প। রোগীদের খাওয়ায় অরুচি, অতিরিক্ত গ্যাস কিংবা কষা পায়খানার উপসর্গ থাকতে পারে- আবার কখনো দেখা দেয় ডায়রিয়া। পেটে পানি থাকতেও পারে, আবার নাও থাকতে পারে।

লিভার ক্যান্সারের চিকিৎসা ও করণীয়
লিভার ক্যান্সার নির্ণয়ে সহজ উপায় একটি নির্ভরযোগ্য আল্ট্রাসনোগ্রাম। তবে কখনো কখনো সিটি-স্ক্যানেরও দরকার পরে। রক্তের AFP পরীক্ষাটি লিভার ক্যান্সারের একটি মোটামুটি নির্ভরযোগ্য টিউমার মার্কার। লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত যে কোন ব্যক্তিরই উচিত প্রতি ৬ মাসে একবার AFR ও আল্ট্রাসনোগ্রাম পরীক্ষা করা। তবে লিভার ক্যান্সারের ডায়াগনোসিস কনফার্ম করতে হলে আল্ট্রাসনোগ্রাম গাইডেড FNAC অত্যন্ত জরুরি আর অভিজ্ঞ হাতের সাফল্যের হারও প্রায় শতভাগ। এখানেই শেষ নয়, বরং শুরু। শুরুতে ধরা পরলে আর আকারে ছোট থাকলে অপারেশনের মাধ্যমে এই টিউমার লিভার থেকে কেটে বাদ দেয়া যায়। আর এর জন্য প্রয়োজনীয় কুসা মেশিন ও দক্ষ হেপাটোবিলিয়ারি সার্জন এদেশেই বিদ্যমান। পাশাপাশি আছে বিনা অপারেশনে টিউমার অ্যাবলেশন বা টিউমারকে পুরিয়ে দেয়া। নামমাত্র খরচে আল্ট্রাসনোগ্রাম গাইডে আমাদের দেশে এখন অহরহই লিভার ক্যান্সারের রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি অ্যাবলেশন করা হয়। পাশাপাশি আল্ট্রাসনোগ্রাম গাইডে সস্তায় অ্যালকোহল দিয়েও অ্যাবলেশন বা টিউমার পুড়িয়ে ছোট করে দেয়া সম্ভব। আছে আরও কিছু আশা। যেমন এসেছে আগের চেয়ে অনেক বেশী কার্যকর, কিন্তু অনেক কম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কেমোথেরাপি জেলোডা ও সুরাফিনেব। এই দুটি ওষুধ আমাদের দেশে তৈরিও হচ্ছে। লিভার ক্যান্সারের রোগীদের চিকিৎসা এদেশে নিয়মিত হচ্ছে। আর তাই লিভারের ক্যান্সারে শেষ হয়নি আশা।

ফ্যাটি লিভার

লিভার কোষে অতিরিক্ত চর্বি জমা হলে যা তার গাঠনিক উপাদানের ৫ থেকে ১০ শতাংশ তাকে ফ্যাটি লিভার বলে। যখন কোনো মানুষ তার দেহের প্রয়োজনের অতিরিক্ত চর্বি খাবারের সঙ্গে গ্রহণ করে, তখন এ চর্বি ধীরে ধীরে তার কলা বা টিসুতে জমতে থাকে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এটি অতিরিক্ত অ্যালকোহল বা মদ্যপানের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু যাঁরা মদ্যপানের সঙ্গে যুক্ত নন, তাঁদেরও এই রোগ হতে পারে। সাধারণত মধ্যবয়সী মহিলাদের দেখা দেয়। স্থূলতা ফ্যাটি লিভারের একটি প্রধান কারণ। এ ছাড়া ডায়াবেটিস, রক্তে চর্বির মাত্রা বেশি (হাইপার লিপিডেমিয়া), বংশগত, ওষুধ এবং বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্য যেমন, মদ বা অ্যালকোহল, স্টেরয়েড, টেট্রাসাইক্লিন এবং কার্বন টেট্রাক্লোরাইড ইত্যাদি কারণে ফ্যাটি লিভার হতে পারে। যাদের ওজন আদর্শ ওজনের ১০ থেকে ৪০ শতাংশ বেশি, তাদের ফ্যাটি লিভার হওয়ার ঝুঁকি বেশি। মুটিয়ে গেলে শিশুদেরও এ রোগ হতে পারে।

ফ্যাটি লিভার রোগের লক্ষণ
রোগীরা সাধারণত ক্লান্তি, অবসাদ, ওপরের পেটের ডান দিকে ব্যথা নিয়ে ডাক্তারদের কাছে আসেন। পরীক্ষা করলে দেখা যায়, রোগীদের এসজিপিটি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। এদের বিলুরুবিনের মাত্রা স্বাভাবিক থাকে। কারো ক্ষেত্রে দেখা যায়, লিভারে অ্যানজাইমের মাত্রা স্বাভাবিক অথচ লিভারের আল্ট্রাসনোগ্রামে চর্বির মাত্রা বেশি।

ফ্যাটি লিভার হলে করণীয় ও চিকিৎসা
পেটের আল্ট্রাসনোগ্রাম, লিভার বায়োপসি পরীক্ষা করলে রোগটি নির্ণয় করা যায়। যদি লিভারের এনজাইমগুলো বেড়ে যায়, তখন বুঝতে হবে, তার ক্ষেত্রে এই ফ্যাটি লিভারের কারণে দীর্ঘমেয়াদি অসুখ হওয়া আশঙ্কা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে রোগির জীবনযাপনের ধরন পরিবর্তন করতে হবে, ওজন কমাতে হবে এবং কিছু ওষুধ খেতে হবে। আর যদি শুধু ফ্যাটি লিভার থাকে, পাশাপাশি লিভারের অন্যান্য কার্যক্রম যদি ভালো থাকে, যদি খুব বেশি স্থূলকায় না হোন, তাহলে শুধু একটু জীবনযাপনের ধরন পরিবর্তন করলে হয়। সুষম খাবার, কায়িক পরিশ্রম, নিয়মিত ব্যায়াম—এগুলো করলে ভালো থাকবেন।

লিভার অ্যাবসেস

লিভার অ্যাবসেস বা লিভারের ফোঁড়া মানব দেহের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ একটি রোগ। লিভারে দুধরনের ফোঁড়া হয়, পায়োজেনিক ও অ্যামিবিক। ইকোলাই, স্টাফাইলোকক্কাই, স্ট্রেপ্টোকক্কাই, ক্লেবসিয়েলা ইত্যাদি ব্যাকটেরিয়া পায়োজেনিক লিভার অ্যাবসেসের জন্য দায়ী, আর অ্যামিবিক লিভার অ্যাবসেস হয় অ্যামিবা থেকে। তবে এসব জীবাণু ঠিক কী কারণে লিভারে ফোঁড়া তৈরি করে তা সব সময় জানা যায় না। তবে ডায়াবেটিস, অ্যাপেন্ডিসাইটিস, গ্যাস্ট্রোএন্টাররাইটিস, রক্তের ইনফেকশন, নবজাত শিশুর নাভির ইনফেকশন, অতিরিক্ত মদ্যপান, পেটে আঘাত পাওয়া ইত্যাদি নানা কারণে লিভারে ফোঁড়া হতে পারে। একজন রোগীর লিভারে একটি বা একাধিক ফোঁড়া থাকতে পারে।

লিভার অ্যাবসেস রোগের লক্ষণ
লিভারের ফোঁড়ার কোনো বিশেষ লক্ষণ নেই। রোগীদের সাধারণত খাবারে অরুচি, জ্বর ও পেটে ব্যথা থাকে। অনেক সময় কাশি কিংবা ডান কাঁধে ব্যথা থাকতে পারে। বিরল ক্ষেত্রে রোগীর জন্ডিস হতে পারে।

লিভার অ্যাবসেস হলে করণীয় ও চিকিৎসা
লিভার অ্যাবসেসের জন্য মূল পরীক্ষা হলো পেটের আল্ট্রাসনোগ্রাম। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রোগের শুরুতে আল্ট্রাসনোগ্রামে অ্যাবসেস ধরা পড়ে না। এ জন্য ৭ থেকে ১০ দিন পর আল্ট্রাসনোগ্রাম রিপিট করলে ভালো। লিভার অ্যাবসেস সাধারণত অ্যান্টিবায়োটিকেই সেরে যায়। তবে লিভার থেকে পুঁজ বের করে দেয়াটা জরুরি। বিশেষ করে লিভারে যদি বড় বা একাধিক অ্যাবসেস থাকে। এক সময় এর জন্য অপারেশনের প্রয়োজন পড়লেও আজ আর তার দরকার পড়ে না। এখন লোকাল অ্যানেসথেসিয়া করে খুব অল্প খরচে আল্ট্রাসনোগ্রাফি গাইডেনসে লিভার থেকে পুঁজ বের করা সম্ভব। এরপর অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করলে লিভারের ফোঁড়া সেরে যায়।

আসলে আমাদের লিভার সুস্থ রাখতে হলে সচেতনতাই সবচেয়ে বড় চিকিৎসা। যেহেতু লিভারকে বলা হয় শরীরের পাওয়ার হাউস তাই লিভারের অসুস্থতার ফলাফল ক্ষেত্রবিশেষে হতে পারে ব্যাপক ও ভয়াবহ। সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ নিরাময় এবং জটিলতামুক্ত থাকা যায়। আশাকরি উল্লেখিত লিভারের জটিল রোগসমূহ, লক্ষণ ও চিকিৎসায় করণীয় বিষয় গুলো আপনাকে লিভারের যত্ন নিতে আরও আগ্রহী করবে।

লিভারের যে কোন সমস্যায় দ্রুত অভিজ্ঞ ডাক্তারের সরণাপন্ন হোক।

সূত্রঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন ও চারপাশে

Leave a Reply

Your email address will not be published.